আলোকিত বাংলাদেশ দেখব কবে?

সামীয়া রহমান:

আপনাদের কানে ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে, আমরা বাংলাদেশের মানুষ বছরে ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস অপচয় করছি শুধু ওয়াসার দেওয়া পানি ফুটিয়ে খাওয়ার জন্য। টিআইবি বলছে, ওয়াসার পানি পানযোগ্য নয়, তাই গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি ফুটিয়ে নিই আমরা। আমি জানি না, এ তথ্য আপনাদের মনে দাগ কাটে কিনা, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অদক্ষতার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের কি বিশাল অপচয় হয়, জনগণের কি বিপুল শ্রম ও অর্থ নাশ হয়। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ কোনো কিছুই তো বিনামূল্যে নয়। দাম দিয়ে আমরা কিনি। তবে পানি শুদ্ধ পাব না কেন? কেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন পাওয়া যাবে না? চিন্তা করুন তো, যখন গ্যাস ফুরিয়ে যাবে, তখন কী হবে!

টিআইবির রিপোর্টমতে, ওয়াসার ৬১.৯ শতাংশ গ্রাহকই বিভিন্নভাবে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। টিআইবির তথ্য মানা না মানা, আমাদের নিজস্ব চিন্তা। কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন কি, এই গ্যাস খরচ করে পানি ফুটানোর চিত্র কি আপনার আমার সবার ঘরের চিত্র নয়?

এদিকে সম্প্রতি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২২টি খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক। অবৈধ সংযোগ, নতুন সংযোগে অনীহা, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না  নেওয়া,  বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেওয়া, মিটার টেম্পারিং, এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো ইত্যাদি অজস্র খাতে দুর্নীতি দেদার চলছে বলে দুদকের ভাষ্য। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু জানান, এ বিষয়ে সরকার খুবই অসন্তুষ্ট এবং এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুদক যে সুপারিশ করেছে সার্বিকভাবে তা খুবই গ্রহণযোগ্য। তিতাসের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সম্পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর মতে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনটি। প্রথমত, শতভাগ বিদ্যুতায়ন। দ্বিতীয়, নিরবচ্ছিন্ন  বিদ্যুৎ সরবরাহ। তৃতীয়ত, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ। যদিও দেশে সব সূচকে বিদ্যুৎ খাতের পরিবর্তন দাবি করা হচ্ছে এবং গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা, সঞ্চালন, বিতরণ, গ্রাহক সক্ষমতা সংখ্যার হিসাবে অনেক বেড়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭। এখন হয়েছে ১৩০টি। ২০০৯ সালে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৯৪২ মেগাবাইট। এখন ২০১৯ সালে সেটি হয়েছে ২১,২৪২ মেগাবাইট। বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী যদি শতকরা হিসাবে ধরি, ২০০৯ সালে ছিল ৪৭ শতাংশ। আর এখন ৯৩ শতাংশ। কিন্তু এত সক্ষমতার পরও জনমনে কিছু প্রশ্ন আছে। কেন এখনো গ্রাম, শহর প্রায়শই ঢাকা পড়ে অন্ধকারে! শুধুই কি মানসম্মত সঞ্চালন/বিতরণ ব্যবস্থার জটিলতা!

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর মতে, চেষ্টা হচ্ছে সমস্যা সমাধানের। বরং আগের থেকে ভালো অবস্থায় আছে দেশের বিদ্যুৎ খাত। উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে দক্ষিণ কোরিয়ার লেগেছে প্রায় ৬০ বছর, সেখানে বাংলাদেশ হয়তো আরও আগেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। সমস্যা হচ্ছে সিস্টেম পুরনো, আর বাংলাদেশ খাল-বিল, নদী-নালার দেশ। তার ওপর ঝড়-ঝঞ্ঝা  প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব মোকাবিলা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতে যাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য অর্থ যেমন প্রয়োজন, প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং অবশ্যই মনমানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আশা করেন, বিদ্যুতায়নের দিক থেকে এ বছরের শেষ নাগাদ হয়তো শতভাগে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া এখনই সম্ভব নয়। তার মতে, আগে দেশে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। সে অবস্থা থেকে বের হয়ে এখন সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ থাকছে না শহর এলাকায়। গ্রামে এ বিচ্ছিন্নতা ২-৩ ঘণ্টা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সঞ্চালনব্যবস্থায় ক্ষতি হলে তৎক্ষণাৎ করার কিছু থাকে না। এর সমাধান কঠিন, তবে অসম্ভব নয় বলে প্রতিমন্ত্রী নিজেই দাবি করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ পেতেই যে দেশে উৎকোচ দিতে হয়, সেখানে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন হবে কীভাবে? বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অবশ্য উল্টো বলেন, মানুষ কেন ঘুষ দেয়? কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ কি সেধে ঘুষ দেয়? যারা এর ব্যবস্থাপনায় আছেন তারা কি তবে নিষ্পাপ! আর অপরাধী শুধু গ্রাহকরা! তবে প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন, মাঠ পর্যায়ে এ অভিযোগ আছে। তার পরও তাদের শতভাগ চেষ্টার কমতি নেই। প্রতিমন্ত্রীর বিশ্বাস, যত দ্রুত প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া যাবে, তত দ্রুতই দুর্নীতি বন্ধ হবে। কিন্তু প্রিপেইড মিটার বা অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন বসানো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।

বিদ্যুৎ চুরি বা অপচয় প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দাবি, এটি অনেকটাই কমে গেছে। ১০-১২ বছর আগে এ দেশে সিস্টেম লস ছিল শতকরা ৪৪ ভাগ। এখন তা শতকরা ১১-১২ ভাগে নেমে এসেছে। খুলশীর মতো কোনো জায়গায় তা ৭ ভাগ পর্যন্ত হয়েছে। সিঙ্গেল ডিজিটে পৌঁছানোর জন্য সামগ্রিক সিস্টেমের উন্নয়ন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৪৫০ কিলোওয়াট। যদি মধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশ পৌঁছতে চায়, তবে তার ব্যবহার বাড়াতে হবে ১২০০ থেকে ১৫০০ কিলোওয়াটে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করলেও ১৩ হাজার কিলোওয়াট। বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক আছে। যার যত ব্যবহার বিদ্যুতে, মানব উন্নয়ন সূচকে সে ততখানি এগিয়ে।

কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বরং মনে করেন, শতভাগ বিদ্যুতায়নের কৌশলের ক্ষেত্রে সরকার বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। সরকার তথ্য সংকটে ভুগছে। স্বার্থান্বেষী মহল প্রকৃত তথ্য না দিয়ে সরকারকে অন্ধকারে রাখছে বলে তিনি মনে করেন। ২০১৭ সালে যখন বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়, তখন বলা হয়েছিল পাইকারি বিদ্যুতে ঘাটতি এসেছে ৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়ে গেল ৮ হাজার কোটি টাকায়। ড. আলমের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের উন্নয়নে যারা কাজ করছেন, তারা সরকারকে কি ব্যাখ্যা করে বলতে পারবেন এক বছরের ব্যবধানে কীভাবে শতকরা ১০০ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি হয়?

অবশ্য বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার অন্ধকারে নেই। বিভ্রান্তিতে আছেন তারা, যারা বাইরে কাজ করছেন। তার দাবি, সরকার সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে, সেটা সোলার করে হোক, গ্রিড লাইনেই হোক। যত দ্রুত তা দেওয়া সম্ভব হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত দ্রুত হবে। ভর্তুকির কারণ হলো, গ্রাহকদের একটি বড় অংশ লাইফ লাইনের মধ্যে থাকে, অর্থাৎ যাদের বিল ৫০ টাকার নিচে। অর্থাৎ ২ টাকার নিচে তাদের চার্জ করা হয়। এখান থেকে এখনই বের হওয়া সম্ভব নয়। যত বেশি বিতরণ হচ্ছে গ্রাহকের সংখ্যা কিন্তু কমছে না, বরং বাড়ছে। আর ভর্তুকি তাদের ক্ষেত্রেই হচ্ছে যারা হতদরিদ্র। তাদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ যেন তারা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে, অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে সে চেষ্টাই করা হচ্ছে। এই লাইফ লাইনের বড় অংশকে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে ভর্তুকি মনে হচ্ছে, কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে সরকার বিনিয়োগ করছে তার দেশের জনগণের ওপর। এ বিনিয়োগ আবার জিডিপিতে প্রভাব ফেলছে।

কিন্তু বিতর্কটি ভর্তুকি বিরোধিতা নিয়ে নয়, যে হিসাবের মধ্য দিয়ে ভর্তুকির অঙ্ক নির্ধারিত হচ্ছে, প্রশ্ন হচ্ছে সেই অঙ্ক নিয়ে। সাপ্তাহিকের সম্পাদক গোলাম মর্তুজার মতে, জ্বালানি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন তেল কেনে, তেলের দাম নির্ধারণ করে, তেলের ক্ষেত্রে তারা ভর্তুকির হিসাব দেখায়। কিন্তু খোদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিরুদ্ধে তেল কেনা, দাম নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন আছে, প্রশ্ন আছে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কেউ কি বিপিসির কার্যক্রম তৃতীয় কোনো পক্ষ বা নিরপেক্ষ কাউকে দিয়ে অডিট করে দেখেছে? আবার যখন বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রসঙ্গ আসে, তখন ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয় ৮ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনা সম্ভব। উল্টো সেখানে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা সাশ্রয়ের কথা বলছেন, আমাদের মন্ত্রণালয় বা সরকার কি কখনো এটি যাচাই-বাছাই করে দেখেছে? কিন্তু বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর মতে, সরকার ভর্তুকিকে বিনিয়োগ মনে করে। ধরা যাক, একটি গ্রামে ১০ কিলোমিটার দূরে বিদ্যুতের লাইন টেনে ট্রান্সফরমার লাগিয়ে ১০টি বাড়িতে বিদ্যুৎ দেওয়া হলো। ওই ১০টি বাড়িতে বিদ্যুতের যে বিল আসবে, আগামী ১০০ বছর বিল দিলেও সে খরচ উঠবে না। একে লাভজনক চিন্তা করলেই ভুল। সামগ্রিকভাবে লাভজনক বিনিয়োগ কিনা তা ভাবতে হবে।

বলা হচ্ছে, আমাদের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। কিন্তু যখন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, বলা হচ্ছে সমস্যা হচ্ছে সঞ্চালনে। সামনে রমজান মাস। সে মাসের বাড়তি চাহিদা তবে পূরণ হবে কীভাবে, যদি সঞ্চালনেই সমস্যা থাকে!

২০০৯ থেকে ২০১৯ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন হয়েছে ঢের। কিন্তু গ্রাহক সন্তুষ্টির কথা কি মাথায় রাখছে সরকার? যদিও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর হিসাবে এই ১০ বছরে বিতরণ হয়েছে শতকরা ৯৩ ভাগ আর গ্রাহক সন্তুষ্টি তাদের গবেষণায় ৮২ ভাগ। এখনই এ মুহূর্তে যদি আমরা শতকরা ১০০ ভাগ গ্রাহক সন্তুষ্টি আশা করি, সেটি অতিরিক্ত প্রত্যাশাই হয়ে যায়।

কিন্তু প্রশ্ন আসে, যদি অর্থের বিনিময়ে আমরা সেবা নিই, তবে তার সন্তুষ্টি কি ১০০ ভাগ হওয়া উচিত নয়? অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর মতে, ১০০ ভাগ পাওয়া সম্ভব যদি আমরা সিলিন্ডারে চলে যাই। ফ্রি গ্যাস তো সরকার দেবে না। কিন্তু কোনো কিছুই কি বাংলাদেশের জনগণ বিনামূল্যে নিচ্ছে বা পাচ্ছে? ডেইলি অবজারভারের প্রধান প্রতিবেদক শাহনাজ বেগমের মতে, গ্রাহক সন্তুষ্টির বিষয় বাংলাদেশের সংবিধানে আছে। একসময় বলা হচ্ছিল সরকার ব্যবসা করবে না। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সরকার গত ১০ বছর ধরে দেখতে শুরু করেছে। জনতা নিশ্চয়ই রাতারাতি পাল্টাবে না। জনতাকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে সবকিছুর জন্য দিতে হবে চড়া বিনিময় মূল্য।

অরুণ কর্মকারের (চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স, বাংলাদেশ) বরং প্রশ্ন, আমাদের দেশে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কি কেউ কখনো করেছে? আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে সোচ্চার হই, যেমন দাম বাড়ানো নিয়ে কথা বলি, কিন্তু বৃহৎ পরিসরে আমাদের দেশের কোনো অর্থনীতিবিদ বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের আর্থিক বিশ্লেষণ করেননি। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের উন্নয়নের প্রাপ্তি নিয়ে বরং প্রশ্ন তোলেন তিনি। আমাদের এত উন্নয়ন। কিন্তু এখন পর্যন্ত রমজান মাসের ব্যবস্থাপনা সেই ২০০৯-এর সুপারিশেই চলছে। ২০০৯-এ যে সুপারিশগুলো ছিল- একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দোকান খোলা থাকবে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সিএনজি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাবে, বেশি লাইট জ্বালানো যাবে না- আজ ২০১৯-এও যদি সেই একই সুপারিশ থাকে তবে উন্নয়নের প্রাপ্তি কী?

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য, মিতব্যয়ী হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে যদি সায়ও দিই, তবে জানতে চাই, একদিকে মন্ত্রী চান বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়–ক, মানব উন্নয়ন সূচকে তবে আমরা এগিয়ে যাব। আবার অন্যদিকে যদি মিতব্যয়িতার প্রশ্ন ওঠে, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাব! অস্বীকার করার কি কোনো উপায় আছে যে, আলোকিত পৃথিবীর সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক নেই? তবে একই সঙ্গে মিতব্যয়িতা আবার বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব কি সাংঘর্ষিক হয় না? অবশ্য আমাদের চৌকস বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য, ব্যবহার বাড়ানো উচিত চাহিদামাফিক এবং আমাদের সক্ষমতামাফিক। তার মতে, বাংলাদেশের জনগণ দিনে কম আর রাতে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। দিন ও রাতের তফাত ৪ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। এই ব্যবহারের ধরন নাকি উন্নত দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সরকার চায় দুটোর মধ্যে ভারসাম্য।

বিদ্যুৎ নিয়ে জানা-অজানায় আমাদের অভিযোগের অন্ত নেই। কারণও আছে। তবে কিছু অদ্ভুত কারণও এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কল ড্রপের দায়ভার চাপিয়েছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর। তাদের অভিযোগ, টাওয়ারে বিদ্যুৎ থাকে না। একবারে গেলে ১৫-২০ ঘণ্টার আগে আসে না। তাদের নিজস্ব সিস্টেমে তারা ৮ ঘণ্টার বেশি চালু রাখতে পারে না। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী উল্টো মোবাইল কোম্পানিগুলোকে অভিযোগ করে বলেন, ১০০ মানুষের জন্য যে সিস্টেম সেবা তারা দিতে পারত, সেই সেবা তারা দিচ্ছে ৫০০ লোকের কাছে। আদতে মোবাইল কোম্পানিগুলো জনগণকে নিজস্ব সক্ষমতার অভাবে সঠিক সেবা দিচ্ছে না বলে মন্ত্রী  অভিযোগ করেন।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে অনেক চিন্তাভাবনা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সোলার বিদ্যুতে কি বাংলাদেশ দাঁড়াতে পারবে? প্রাইভেট সেক্টরে ৫০-এর অধিক প্রতিষ্ঠানকে সোলার পাওয়ার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর মতে, হচ্ছে না তার কারণ হলো ভারতের চেয়ে আমাদের রোদের আলোর তীব্রতা কম, জমির স্বল্পতা সবচেয়ে বড় একটি বাধা। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে না। এর জন্য প্রয়োজন ৪০০ একর অকৃষিযোগ্য জমি। এ জমি পাওয়াটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চরও ব্যবহার করা যাচ্ছে না, কারণ চর থেকে যে লাইন আনা হবে, সেই গ্রিডে যে পরিমাণ লোকসান হবে সেটাও ভাবনার বিষয় বৈকি। তার পরও সৌরবিদ্যুৎ দিন শেষে লাভজনক। ক্যাপাসিটি চার্জও এখানে দিতে হবে না। কিন্তু জমির স্বল্পতা সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েই থাকছে।

আমরা সমুদ্রসম্পদ জয় করেছি। কিন্তু গভীর সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ পাইনি। ওদিকে মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দিয়েছে। সরকার বলছে দুটো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা সার্ভেও করেছিল, কিন্তু বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমে যাওয়ায় তারা আবার চলে গেছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানই গভীর সমুদ্রে কাজ করে যারা বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে পারে। আবার সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস পাওয়া গেলেও আনা হবে কীভাবে, আর তখন এর যে দাম হবে, সেই দাম দিয়ে কে কিনবে, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন এবং ঝুঁকিও বটে। আমরা শর্ত দিয়ে রেখেছি যে এই গ্যাস বাইরে বিক্রি করব না। কিন্তু গভীর সমুদ্র থেকে নিয়ে আসার পরে, এর যে দাম হবে সেই দাম দিয়ে যদি আমরা না কিনি তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে!  প্রতিমন্ত্রীর মতে, বৈষম্যমূলক পিএসি চুক্তিও সংশোধন করা দরকার এবং এই সংশোধন ইতিমধ্যে করা হচ্ছে।

সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রথম পরিকল্পনা ছিল সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ৩৫০-৪০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চলে গেছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েই বলেন, আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ যথেষ্ট সাশ্রয়ী হবে, কারণ বড় পাওয়ার প্লান্ট সব চলে এসেছে। কাজ শুরু হয়ে যাবে আগস্টেই।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রাহক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা, পাইপলাইন গ্যাসের সঙ্গে সংযুক্ত ৪০ ভাগ আর বাইরের এলপিজি ব্যবহার করা ৬০ ভাগ জনগোষ্ঠীর দামের বৈষম্য নিরসনে সরকারের ভূমিকা, বিদ্যুতের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়, উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির খরচ, মানসম্মত সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থা ইত্যাদি অভিযোগ বা প্রস্তাব আছে অজস্র। অস্বীকার করা যাবে না যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে আমরা অনেকখানি এগিয়েছি, কিন্তু আবার এও স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশকে যদি আমরা মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে দেখতে চাই, তবে যেতে হবে বহুদূর। ছেঁটে ফেলতে হবে দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতার আগাছাগুলো। ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা আবার এও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মেগা প্রকল্প দরকার। কিন্তু অনেক প্রকল্প থেকে হাজারো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে সিস্টেমের ওপর চাপ পড়তে পারে। সেদিকটাও খেয়াল রাখা জরুরি। বিদ্যুৎ আমাদের চাই, গ্যাস ব্যবহারের সুবিধা চাই। অস্বীকার করা যাবে না যে, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ অপচয়, কারিগরি সিস্টেম লস, দুর্নীতির কারণে সিস্টেম লস, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ইত্যাদি হাজারো সীমাবদ্ধতা আছে আমাদের। প্রশ্ন এখন একটাই- মানসম্মত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য আর কতটা সময় লাগবে আমাদের? উন্নত বিশ্বের মতো আলোকিত বাংলাদেশ দেখার সৌভাগ্য নিশ্চয়ই এ জন্মেই আমাদের হবে।(সংগ্রহীত)

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *