ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অপশক্তি

ফরিদ আহমদ দুলাল : ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ কথাটা আমাদের জীবনে খুব পুরোনো নয়, সাম্প্রতিক সময়ে কথাটা বেশ শুনতে পাচ্ছি। আসলে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ধারনাটা কী? স্থুল মেধায় আমি নিজে যা বুঝি, সেটা বলি, যদি ভুল হয় সংশোধন করে দেবেন। ধরা যাক, আপনি একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন, হতে পারে সেটা আপনার মেয়ের বিয়ে, অথবা আপনার বাড়ির রি-মডেলিং, গুণিজন সম্মাননা অনুষ্ঠান, অথবা ইফতার আয়োজন; আমন্ত্রণপত্র মুদ্রণ থেকে সাজসজ্জা আবাসন, আপ্যায়ন ইত্যাদি সবই ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আপনার পক্ষে করে দেবে। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের জীবনে এ আর নতুন কী? বহু যুগ ধরেই প্রয়োজনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদারী চলছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন যখন প্যাকেজ প্রোগ্রাম চালু করে, তার যে প্রক্রিয়া আজ বুঝি সেটাও একধরনের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টই ছিলো। পার্টিসেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার নামে যেসব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দেশে দাপটের সাথে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাকেও তো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বলেই আখ্যা দিতে পারি। ১৯৭০-এর ১ সেপ্টেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তমকুমার-তনুজা অভিনীত একটা ছবি দেখেছিলাম ‘রাজকুমারী’ নামে। খুব ভালো একটা ছবি, ছবিতে ছায়া দেবী, পাহাড়ী সান্ন্যাল, তরুণকুমার, অসিতবরণ, দীপ্তি রায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়সহ অনেকেই অভিনয় করেছিলেন। ছবির কাহিনী-চিত্রনাট্য-সংলাপ ও পরিচালনায় ছিলেন সলিল সেন, গীতিকার: গৌরীপসন্ন মজুমদার, সুরকার রাহুল দেববর্মন, আর গানের শিল্পী ছিলেন কিশোর কুমার এবং আশা ভোঁসলে। স্মরণে আনার জন্য ছবির কয়েকটি গানের কথা মনে করছি-
* আজ গুন গুন গুন যে আমার একি গুঞ্জরণ
গানের সুরে পেলাম এ কার প্রাণেন নিমন্ত্রণ।

* বন্ধ দ্বারের অন্ধকারে থাকবো না
মনকে তো আর বন্দি করে রাখবো না।

* এ কী হলো কেনো হলো
জানি না জানি না।
ইত্যাদি বেশ ক’টি জনপ্রিয় গানও ছিলো ছবিটিতে। তনুজা, যিনি হাল আমলের হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা কাজল-এর মা; তাঁর চরিত্রটি ছিলো রাজকুমারী-মঞ্জরী। মা ছায়া দেবীর কঠোর অনুশাসনে বেড়ে উঠছিলেন, কিন্তু ইন্সোরেন্স কোম্পানির চাকুরে উত্তমকুমারের (নির্মল) সাথে রাজকুমারীর পরিচয়, অতঃপর প্রণয়। মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজকুমারী বিয়ে করতে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে, কিন্তু ঘটনাচক্রে বিয়েটা হয়নি; ইত্যাদি।
সেই ছবির একটা দৃশ্যে আছে, উত্তমকুমার বিয়ে সম্পাদনের জন্য একটা কোন এক সোসাইটির ম্যানেজারের কাছে গেছেন, সেখানে দু’জনের সংলাপ:
উত্তম: আপাতত এইটে রাখুন, যদি আরও কিছু টাকাকড়ি লাগে, পরে দেওয়া যাবে। তবে দেখবেন, যেনো বিয়েটা ঠিক সুষ্ঠুভাবে হয়ে যায়; বুঝলেন তো আমার লোকবল বলতে বিশেষ কিছু নেই, মেয়ের তো কেউ-ই নেই!
ম্যানেজার: ঠিকআছে ঠিকআছে, আপনি কিচ্ছু ভাববেন না নির্মলবাবু সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক থাকবে। আমাদের সোসাইটির মেম্বাররা সব উপস্থিত থাকবেন। আর বিয়ে? সব শাস্ত্রমতো হবে। তবে কী, সোমবার মানে আটটায় লগ্নের একটু আগে আপনারা সব এসে উপস্থিত হবেন; তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ইত্যাদি-ইত্যাদি।
অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কনসেপ্টটা বাঙালির জীবনে নতুন নয় এবং খারাপ কিছুও নয়। তাহলে ও নিয়ে কথা বলবার আবশ্যিকতা কী? সামান্য আবশ্যিকতা আছে বৈকি।
কর্পোরেট বিশ্বে আমাদের জীবন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমরা যে কখন নিজের মাথাটাই কর্পোরেট মেধার কাছে সমর্পণ করছি, নিজেই টের পাচ্ছি না; যখন টের পাচ্ছি, তখন আর মাথাটা নিজের নিয়ন্ত্রণে, নিজের কাছে নেই। আমি কী খাবো, কী পরবো, কী-সে চড়বো, কোন পথে হাঁটবো, কোন গান গাইবো, কার সাথে মিশবো, কোথায় ঘুমাবো, সবই নির্ধারিত হবে কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে। কর্পোরেট বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট যখন আমার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ নিজ দায়িত্বে তুলে নিতে চায় তখন সামান্য ক’টি কথা বলার আবশ্যিকতা হয়ে যায়। বিশেষকরে নিজেকে সচেতন করতে বাস্তবতাটা সামনে এনে দেখে নিতে চাই।
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, কোথায়-কখন-কীভাবে আমার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর হাতে চলে গেল? আমরা তো দেখতে পাচ্ছি, কবিরাই কবিতা লিখছেন, শিল্পীরাই ছবি আঁকছেন, গান গাইছেন, নাচছেন, আবৃত্তি করছেন; তাহলে ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর হাতে চলে গেল কীভাবে? আমার কথাটা সেখানেই। হ্যাঁ এ কথা সত্যি, যাঁরা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করছেন সমাজে তাঁরা কবি-শিল্পী-সংস্কৃতজন হিসেবেই পরিচিত; কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে দেখুন এঁরা ক’জন সত্যি আর ক’জন ছদ্মবেশী। যিনি কাব্যচর্চায় নেই, তিনিই যখন কবিতার সংগঠনের নেতৃত্বে বসে কবিদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খান, যখন একজন সন্ত্রাসী-অর্থলিপ্সু নাট্যমোর্চার নেতৃত্বে বসে থাকেন, নৃত্যশিল্পীদের নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের সাথে শিল্প-সাহিত্যের পক্ষে দেন-দরবার করেন, এবং সুযোগ পেলেই নিজের আখের গুছিয়ে নেন; তেমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার কী বলা উচিত?
আমি অবশ্য ঐসব ক্ষমতা ও অর্থলিপ্সুদের এককভাবে দোষী করছি না, পাশাপাশি শিল্পী-সাহিত্যিকদের যারা কোণাকোণি পথে হেঁটে সাফল্য পাবার মোহে নিজেদেরকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে সমর্পণ করেন, তাঁদেরও অপরাধি বলছি। আমরাই তো ঈর্ষায়, হিংসায়, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার জন্য নিজেদেরকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে সমর্পণ করছি। নিজেদের আমরা সমাজের প্রাগ্রসর শেণি দাবি করে যখন নিজেরাই অপরিনামদর্শিতার স্বাক্ষর রাখি, তখন ধান্দাবাজদের বিপক্ষে কথা বলে কী হবে?
আমি বরং বলি, আসুন আমরা সচেতন হই, যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট আমাকে উন্মূল করে দিতে চায়, আমাকে আমার সংস্কৃতির মূল ধারা থেকে বিচ্যূত করতে চায়, নিজেকে ছদ্মাবরণে রেখে বাঙালির ইতিহাসকে বিপন্ন করতে চায়, ত্রিশলক্ষ মানুষের রক্তঋণের কথা বিস্মৃত করাতে চায়, বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে নানান অপকৌশলে খর্ব করতে চায়; আসুন আমরা তাদের প্রতিহত করি। তাদের মিষ্টি-কুশলী কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে আসুন আত্মমর্যাদাশীল হয়ে উঠি; আসুন যত্নের সাথে চিনে নিই সুবেশ-মুখোশধারীদের এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অশুভ অংশকে প্রতিহত করি।

 লেখক: কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *