ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু কিডনি বিকলে

দেশে ২ কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। ঘণ্টায় পাঁচজন মারা যায় কিডনি বিকল হয়ে। চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেকেই মধ্যপথে বন্ধ করে দিচ্ছে চিকিৎসা। সচেতনতা, চিকিৎসক ও চিকিৎসার পর্যাপ্ততা এবং মৃত ব্যক্তির কিডনি সংগ্রহে আইনি বিধিমালা সংশোধনে কিডনি রোগের মরণ কামড় কমিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। বছরে এ রোগে মারা যায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ‘১০ বছর আগে সাভারের চাকুলিয়া গ্রামে একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল ১৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২ কোটির হিসাবটি সঠিক ধরা হয়।’ এই বিপুল পরিমাণ রোগীর বিপরীতে দেশে চিকিৎসকসংখ্যা নামমাত্র। আন্তর্জাতিক মানদ অনুযায়ী, ৫০ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একজন নেফ্রোলজিস্ট থাকা দরকার। দেশে নেফ্রোলজিস্ট আছেন মাত্র ১৭০ জন। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ধরা হলে ১০ লাখ মানুষের জন্য একজন করে নেফ্রোলজিস্ট আছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত তালিকায় দেখা যায়, দেশে সরকারি-বেসরকারি ৪৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ডায়ালাইসিস শয্যা আছে ৫৭০টি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিডনি রোগ বাংলাদেশে আগে থেকেই ছিল কিন্তু সেভাবে শনাক্ত হতো না। এখন দেখছি কিডনি রোগ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ মুটিয়ে যাচ্ছে, ডায়াবেটিস বেড়ে যাচ্ছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনি আক্রান্ত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে প্রায় ৩০-৪০ হাজার মানুষের ডায়ালাইসিসের দরকার হয়ে পড়ে। সেই সুবিধা আমাদের নেই। সরকারি কিছু আছে, বেসরকারি হাসপাতালে কিছু ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা আছে। এটা খুবই ব্যয়বহুল। প্রতি সেশনে ৩-৪ হাজার টাকা লাগে। সরকারি হাসাপাতালেও আড়াই হাজার টাকার মতো লাগে। সরকার দু-একটি জায়গায় সুলভে সেবা দিচ্ছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে প্রতি বিভাগীয় শহরে একটি করে ১০০ বেডের কিডনি হাসপাতাল স্থাপন করা। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ৫ বেডের একটি করে ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। জেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে খুব বেশি জায়গা নেই। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যেই আশা করছি এ কাজ সম্পন্ন হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনিতে প্রদাহ ও আরও কিছু কারণে মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসা হিসেবে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনকেই প্রধান বিকল্প হিসেবে বেছে নেন চিকিৎসকরা। অধিকাংশ কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের এক বছরের মাথায় খরচ সামলাতে না পেরে ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেন। সপ্তাহে সাধারণত তিনটি ডায়ালাইসিস নিতে হয়। সঙ্গে একটি এরিথ্রপোয়েটিন ইনজেকশন। সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি ডায়ালাইসিসের নূন্যতম মূল্য ৩ হাজার টাকা। সপ্তাহে খরচ ৯ হাজার টাকা। সঙ্গে ইনজেকশন ২ হাজার টাকা। টেস্ট, যাতায়াতসহ অন্যান্য ব্যয় মিলে সপ্তাহে খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। মাসে ৬০ থেকে ৮০ হাজার। উন্নত বেসরকারি হাসপাতালে এ ব্যয় মাসে লাখ টাকার ওপরে। সরকারি হাসপাতালে এ খরচ কম হলেও সেবা সীমিত ও যন্ত্রপাতি কম। এর মধ্যে আবার কিছু নষ্ট। যা আছে তা সর্বক্ষণ চালানো হয় না। অন্যান্য রোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগীদের সুলভ মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে রাজধানীতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহায়তায় পরিচালিত গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার। ধানমন্ডির মিরপুর রোডে অবস্থিত এ হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিস চার্জ রাখা হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। সপ্তাহে তিন সেশনে সেবা নিলে দেওয়া হয় ৬০০ টাকা ছাড়।

অন্যদিকে আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কিডনি প্রতিস্থাপন। মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ অনুযায়ী শুধু রক্তের নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ কিডনি দিতে পারে না। ফলে বছরে দেশে মাত্র ২০০-এর মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। বাকিদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে তারা বিদেশে পাড়ি জমায়। সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের খরচ ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা। বাংলাদেশে কিডনি পাওয়া গেলে প্রতিস্থাপন খরচ ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ৪-৫ লাখ টাকা। মৃত ব্যক্তির কিডনি সংগ্রহে আইন সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কিডনি না পাওয়ায় ও ডায়ালাইসিস খরচ মেটাতে না পারায় রোগীরা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সূত্রে জানা গেছে, এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৫৩৯ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। কিডনি প্রতিস্থাপনকৃত রোগীর ৯৫ শতাংশ বাঁচেন কমপক্ষে এক বছর। ৮২ শতাংশ কমপক্ষে পাঁচ বছর এবং ৭৮ শতাংশ কমপক্ষে ১০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৭৬০ জন রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জন রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ একবারে হয় না, পাঁচটি ধাপে হয়। প্রথম থেকে তৃতীয় ধাপ পর্যন্ত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তাই কারও কিডনি রোগ শনাক্ত করতে বছরে অন্তত একবার পরিবারের সবাইকে কিডনিসংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো করানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।(সংগ্রহিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *