জাতীয় শিশু দিবস, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু

কাজী আনিসুল হক, বিডি নিউজ আই; আজ ১৭ মার্চ জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের জন্মদিন। বাংলাদেশের জাতীয় শিশু দিবস। বিভিন্ন দিবস, ব্যক্তি ও ঘটনার স্মরণে গুগল তাদের হোম পেজে বিশেষ লোগো তোলে, যা ডুডল হিসেবে পরিচিত। এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন দিবস ও ব্যক্তির স্মরণে এ ধরনের ডুডল প্রকাশ করে গুগল। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শব্দ দু’টি একই সূত্রে গাঁথা। শব্দ দু’টি একে অপর থেকে পৃথক করা যায় না। বাংলাদেশের ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়েই বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব। বাংলাদেশের তরুন-তরুনী, আবাল-বৃদ্ধ সকলের মনের প্রতিচ্ছবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। এ দিন জাতীয় শিশু দিবস। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন বাংলাদেশের খুশির দিন।
বাংলাদেশের এ খুশির দিন সর্বপ্রথম উদযাপন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমিতি ইন্দিরা গান্ধী। তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে তাঁর দেশের সৈন্য বাহিনী সরিয়ে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের উপহার দেন। শ্রীমতি গান্ধির সেদিনের ঘটা করে পালিত এ দিনটি বাংলাদেশে আজ ঘোষিত হয়েছে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে। কেন এই শিশু দিবস? এই দিবসের মাহাত্ম কী? জাতীয় শিশু দিবসের শিক্ষা কী? শিশুদের দিয়ে শুধু দু’একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা করলে, সামনে ক’জন শ্রোতা বসিয়ে বক্তৃতা করলে আর হাততালি মারলেই কী শিশু দিবসের সব কাজ হয়ে যায়? হ্যাঁ, স্বীকার করছি, উল্লিখিত বিষয়গুলো জাতীয় শিশু দিবস পালনের অংশ হতে পারে। তবে এ দিবসটির মূল শিক্ষা হলো, বাংলাদেশের ‘অবিসংবাদিত’ ও মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শ বাংলাদেশের সকল শিশুদের হৃদয়ে পৌছে দেওয়া এবং তার আলোতে আলোকিত হওয়ায় এ দিবসটির মূল লক্ষ্য।

মুজিব শব্দের অর্থ উত্তরদাতা। শেখ মুজিবুর রহমান এমন মহান নেতা যে, তিনি বাঙালিদের নিকট থেকে পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও উপাধি। এসবের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির জনক, রাজনীতির কবি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু যে মার্চ মাসে জন্মেছেন সেই মার্চ মাস বাঙালি জাতীয় জীবনে অতিগুরত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের ২ তারিখেই স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতকা উত্তোলিত হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাঙালি নিপিড়িত জাতর মুক্তির জন্য কালজয়ী ভাষণ দেন। ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসের অধ্যায়ে একটি কালো রাত। এদিন তাঁকে গ্রেফতার করতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কারাগারে গোপনীয় কোডে তার নাম লিপিবদ্ধ করেন “বিগ বার্ড” হিসেবে। ২৬ মার্চ তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অতঃপর দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে বাঙালি মহান বিজয় অর্জন করে।
১৭ মার্চ কেন বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে শ্রম দিয়েছেন তা বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুদের জন্য অনুকরনীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এমন স্বীকৃতি। এখানে আরেকটি প্রশ্ন হলো শিশু কে? আইনগত সংঙ্গা ব্যাতিরেখে আমরা যদি শিশুর একটি সংঙ্গা বের করি তবে অক্রফোর্ড ইংরেজি অভিধানের মতে “ শিশু হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি একটি নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ধারণা ও মনোভাবের দ্বারা কঠিনভাবে প্ররোচিত হয়ে থাকেন”। বঙ্গবন্ধুর এ গুনটি ছিল বলে তিনি জন্মের পর থেকে একটি ধারণা, আদর্শ ও মনোভাবের দ্বারা সারাক্ষণ তাড়িত হয়েছেন। তাঁর সে ধারণা ও আদর্শ হলো একটি স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’। সেই বিচারে তিনি একজন শিশু। বঙ্গবন্ধু যদি শিশু হোন তবে পিতা কে? পিতার সংঙ্গা কী হবে? পিতা হতে চাইলে মানুষের কী গুনাবলি থাকা দরকার? আমরা জানি, মানুষসহ অন্যান্য প্রাণির পিতার হওয়া যায় মিলনের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততির জন্ম দিয়ে। তবে জাতির পিতা আর সন্তান-সন্ততির পিতা হওয়ার ব্যাপার এক নয়। জাতির পিতা হচ্ছেন তিনি, ‘যিনি প্রথম মানব হিসেবে নতুন একটি ‘স্বাধীন সার্বভৌম’দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন পথ আবিস্কার করেন, কৌশল নির্ধারণ করেন ও তা গণমানুষের দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গণমানুষকেই সাথে নিয়ে তার বাস্তব রূপ দেন।” স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু এ কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই বিচারে তিনি বাঙালি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুই বাংলার এমন নেতা যিনি মানুষের হৃদয়ের কথা বুঝেছেন। বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছেন। বাঙালির এ মহান বিজয় টেবিলে বসে দু’দেশের প্রতিনিধির মধ্যে হ্যান্ডশেক করে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে ছবি তুলে জানান দেবার বিজয় নয়। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার ইতিহাস। বঞ্চনার সে ইতিহাসকে পেছনে ফেলে জয়ী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। ।

জাতীয় শিশু দিবসে বাংলাদেশের তুরুন সমাজ তাদের দেশকে নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরী করতে চায়। প্রতিবেদনটি হলো বাংলার মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিল? ইজ্জত ও সম্ভ্রম দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ সময়ে সময়ে কেমন দিন কাটিয়েছে? যেহেতু সব ছাপিয়ে বাঙালি নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করেছে তাই পেছনের ইতিহাস একটু স্কিপ করে স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতে চাই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। জাতির পিতার পরিবারে আদরে এদেশটি সমৃদ্ধশালী হয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো। সদ্য স্বাধীন দেশটি পৃথিবীর বিষ্ময় হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়াতে শিখলো। অতঃপর মাত্র চার বছর অতিবাহিত হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ নামক এই শিশু সন্তানটি তার পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে গেল। ১৯৯১ সালে ক্ষমতার পালাবদলে দুর্নীতির করালগ্রাসে বিদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ। থমকে যায় এদেশের পথচলা।
এরপর পেরিয়ে যায় একুশ বছর। যুবক বয়সে পৌছে বাংলাদেশ। একুশ বছর পর পঁচিশ বছর বয়সী বাংলাদেশ ফিরে পায় তার প্রকৃত পিতার (বঙ্গবন্ধু) পরিবারের সদস্যদের। কঙ্কালসার বাংলাদেশ তার পরিবারে ফিরে এসেই নতুন জীবন লাভ করতে থাকলো। এই অবহেলিত পঁচিশ বছর বয়সে যত মানুষ তার বুকে জন্মগ্রহণ করেছিল সবাই নতুন পথের দিশা ফিরে পেত লাগলো। বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় পৃথিবীর বুকে নিজের সম্মাান ছড়িয়ে দিতে আরম্ভ করলো। মধ্যযুগীয় শাষণ আইনের আমূল পরিবর্তন করে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নীতিমালার সূচনা হতে থাকলো।
বর্তমানে দেশের প্রধান ক্ষমতাশীল দলের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাষণভারের দায়িত্ব ফিরে পেয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে। সেই থেকে বাংলাদেশ হলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। দারিদ্র বিমোচনের রোল মডেল বাংলাদেশ। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বাংলাদেশ। শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ। উন্নয়ন ও উদ্ভাবনশীলতায় বীরদর্পে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূর্ণ বাস্তবায়ন হতে চলেছে। বাংলাদেশ এখন আমার অহংকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *