বিটিআরসির সিদ্ধান্তে ধরাশায়ী গ্রামীণফোনের শেয়ার

টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর একটি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রভাব পড়েছে গ্রামীণফোন লিমিটেডের শেয়ারে। ওই সিদ্ধান্তের প্রভাবে গত দুই দিন ধরে টানা দর হারিয়েছে ব্লুচিপ এই কোম্পানিটির শেয়ার। দুই দিনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কমেছে ৪ শতাংশের বেশি।

উল্লেখ, বিটিআরসি গত সপ্তাহে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনকে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতাসম্পন্ন পরিচালনাকারী (এসএমপি অপারেটর) হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার গ্রামীনফোনকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে বিটিআরসি গ্রামীণফোনের করণীয় ও বর্জনীয় কার্যক্রম ঠিক করে দিতে পারবে।

বাজারে প্রতিযোগিতা ও শৃঙ্খলা আনতে গ্রামীণফোনকে এসএমপি অপারেটর হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক। রোববার রাতে দৈনিক প্রথম আলো এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়।

গত বছরের নভেম্বর মাসে বিটিআরসি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে ‘তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা প্রবিধান মালা-২০১৮’ জারি করে। এতেই কোনো মোবাইল অপারেটর গ্রাহকসংখ্যা, রাজস্ব অথবা তরঙ্গ—এ তিন ক্ষেত্রের একটিতে ৪০ শতাংশের বেশি বাজার হিস্যাধারী হলে এসএমপি অপারেটর হিসেবে ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়া হয় বিটিআরসিকে। বিটিআরসির চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্রামীণফোন গ্রাহকসংখ্যা ও অর্জিত বার্ষিক রাজস্বের দিক দিয়ে ৪০ শতাংশ বাজার হিস্যাধারী।

সংশ্লিষ্টদের আশংকা, প্রতিযোগিতার অজুহাতে বিটিআরসি যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে অন্য অপারেটররা বাড়তি সুবিধা পাবে, তাতে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ও ব্যবসা কমে যেতে পারে। আর তাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কোম্পানিটির মুনাফার ওপর। এই আশংকার প্রভাবেই দু’দিন ধরে দর হারিয়েছে গ্রামীণফোনের শেয়ার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত রোববার গ্রামীনফোনের শেয়ারের ক্লোজিং মূল্য ছিল ৪০৬ টাকা ১০ পয়সা। পর দিন তা ৮ টাকা ৫০ পয়সা বা ২ শতাংশ কমে ৩৯৭ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে আসে। মঙ্গলবার গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম আরেক দফা কমে ৩৮৮ টাকা ৬০ পয়সা হয়, যা আগের দিনের চেয়ে ৯ টাকা বা ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কম।

রেগুলেটরের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে শেয়ারবাজারে কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ারের দামে বিপর্যয় এর আগেও ঘটেছে। ২০১৫ সালের শেষ ভাগে জ্বালানি-বিদ্যুত খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কারো সাথে পরামর্শ না করে তালিকাভুক্ত কোম্পানি তিতাস গ্যাস এর গ্যাস সঞ্চালন ফি কমিয়ে দেয়। তাতে কোম্পানিটির মুনাফা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশংকা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ তাদের কাছে থাকা তিতাস গ্যাসের শেয়ার বিক্রি করে দিতে থাকেন। তাতে বাজার অস্থির হয়ে উঠে। ওই সিদ্ধান্তের আগে পর্যন্ত বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে তিতাস গ্যাসের শেয়ারের বড় মজুদ ছিল। সঞ্চালন চার্জ কমানোর সিদ্ধান্তে তাদের মধ্যে শুধু তিতাস গ্যাস নয়, সামগ্রিক বাজার সম্পর্কে হতাশা ও অনাস্থা তৈরি হয়। এর প্রভাবে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনেকে তাদের কাছে থাকা অন্য শেয়ারও বিক্রি করে দিতে থাকলে বাজার বেশ নিম্নগামী হয়ে যায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে বাজারের টানা পতনের জন্য বিইআরসিকে দায়ী করে।

তিতাসের পর দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে গ্রামীণফোন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের নেতিবাচক শিকার হয়েছে। যদিও বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাজারে প্রতিযোগিতা ও শৃঙ্খলা আনতে আমরা গ্রামীণফোনকে এসএমপি অপারেটর হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এ ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়া করা হচ্ছে না। কাউকে ক্ষতিগ্রস্তও করা হচ্ছে না। বিধি অনুযায়ী কাজ করছে বিটিআরসি।’কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এ কথার ওপর তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না। আর এই অনাস্থারই স্পষ্ট প্রতিফলন শেয়ারের দামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *