মৃত্যুর মিছিল, এখন যা করণীয় – স্থপতি তাসলিহা মওলা দিশা

বিডি নিউজ আই ডেক্স :

 

এমন না যে পুরান ঢাকায় অনেক পুরাতন স্থাপত্য নন্দিত বাড়ি আছে তাই সেসব সংরক্ষণ করতে হবে। ছুটা ফাটা যা আছে সেগুলো সনাক্ত করে, বাকি এলাকা নিয়ে কাজ করতে হবে। ঢালাও ভাবে “পুরো এলাকা বানিজ্যিক কাজে ব্যাবহৃত হবে” বা “শুধুমাত্র আবাসিক কাজে ব্যাবহৃত হবে” এমনটা ভাবা বা পরিকল্পনা নেয়া বোকামি। ঢাকার এ অঞ্চলকে নিয়ে কাজ করতে হলে এর বিগত ৪০০ বছরের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। বুঝতে হবে এ এলাকার চারিত্রিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য।
“Shop House” concept টি শত বছর ধরে এ এলাকায় প্রচলিত। পূর্বে দোতলা বা তিনতলা বাড়িঘর ছিল এখন তা সাত, আট দশ তলাও হয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে। এখন ব্যাবসার পরিধি অনেক বেড়েছে। মানুষ বেড়েছে।সাথে ঝুঁকি ও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। আগে এসব কারখানার কাজ শাঁখা, কাঁসা, চুড়ি, বিস্কুট, দাঁ বঁটি, বোতাম ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেখানে কসমেটিকস, লাইটার, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ইত্যাদি তৈরী হচ্ছে। প্রায় প্রতিটা বাড়িতে আছে টন খানেক অতি দাহ্য পদার্থ বা highly combustible material এর মজুদ। এসব দিক মাথায় রেখে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরো পুরান ঢাকাকে বাস যোগ্য করে তোলা সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার এলাকাবাসীর সদিচ্ছা। আমরা সবাই জানি ঢাকার এ অংশে “মহল্লা” কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। মহল্লায় যা সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাই চুড়ান্ত।
*সবার আগে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নজরদারীর আওতায় আনতে হবে। হাজার চেষ্টা করলেও স্থানীয়দের দৌরাত্ম্যে এখানে কাজ করা যায়না। সাথে আছে বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তারা।
*শুধুমাত্র কেমিক্যাল গোডাউন বন্ধ করাই সমস্যার সমাধান না। পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে কারখানা। বোতাম থেকে শুরু করে হেন জিনিস নাই এখানে বানানো হয়না। এগুলোকে আইডেন্টিফাই করতে হবে। মানুষের পেটে লাথি পড়লে মরলেও তারা এসব উন্নয়নমুলক কাজ করতে দেবেনা। সুতরাং তাদের relocate করা একটা বড় কাজ।
*কারখানা আর বাসস্থান একজায়গায় রাখা যাবেনা।
শুধু এই দুই ব্যাবহার আলাদা করলেই হবেনা। কারখানা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেন নিরাপদে কার্যক্রম চালাতে পারে তার জন্য সকল ব্যাবস্থা নিতে হবে।
*ঝুঁকিপূর্ণ সকল কারখানা সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে হবে।
*সকল কেমিক্যাল গোডাউন অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে হবে।
*ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিতে হবে।
* পুরো এলাকাকে ধাপে ধাপে land readjustment এর মাধ্যমে জমি একত্রীকরণ /land consolidation করে নতুন ভাবে ডিজাইন করতে হবে। এ কাজটা সবচাইতে কঠিন। কেউ কারো জমি ছাড়তে চাইবেনা। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে কি approach নিয়েছে তা দেখা যেতে পারে।
* পুরান ঢাকার জন্য আলাদা ভাবে একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে। এর মাঝে রাস্তা ঘাট চওড়া করা, আপৎকালীন যান চলাচল নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।
* এলাকার মানুষকে ভূমিকম্প, আগুন ইত্যাদি দুর্যোগ মোকাবিলা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে ও বিশেষ ট্রেনিং দিতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটা Participatory approach এবং কর্তৃপক্ষের direct intervention উভয়ের সংমিশ্রণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। এলাকার লোকের খুব বেশী participation ও এক্ষেত্রে কাজে বাধা সৃষ্টি করবে।
কারণ এরা অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে।
শুধু ঢাকার নতুন অংশে রাস্তা ঘাট/ অতিকায় অট্টালিকা / ফ্লাইওভার/ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে না বানিয়ে কিছু টাকা শহরের পুরাতন অংশের জন্য বরাদ্দ করা হোক। মেগা প্রজেক্ট গুলো জিডিপি বাড়াবে, সন্দেহ নাই। পুরান ঢাকায় যে পরিমাণ ব্যাবসা বানিজ্য হয়, সঠিক পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসলে তা আরো বাড়বে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাথে বাড়বে মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা।
আমরা এই লাশের মিছিল আর দেখতে চাইনা। আজ আমিও নাম লেখাতে পারতাম পুড়ে অংগার হওয়া হতভাগাদের কাতারে। আমরা অনেকেই কাজে অকাজে শহরের এই অংশে যাওয়া আসা করি। প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যামে রিক্সায় বসে থাকি। কতটা হতভাগ্য হলে মানুষের এমন মৃত্যু হয়! আর কতটা উদাসীন হলে এমন মৃত্যু আমাদের বারে বারে দেখে যেতে হয়।
এদেশে বছরে ছয়লাখ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়। ছয় লাখ! চিন্তা করা যায়? এত বড় বার্ণ ইউনিট না বানিয়ে বার্ন হবার হার কমানোর দিকে আমাদে নজির দেয়া উচিৎ।
আজ সারাদিন শুধু একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে “কবে আমাদের টনক নড়বে, আর কত লাশের মিছিলের পর”?

বিডি নিউজ আই ডট কম:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *