খালেদা জিয়ার নির্বাচনের পথ কি বন্ধ?

মঙ্গলবার হাইকোর্টের এক রায়ের কারণে কারাগারে আটক বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্বাচনে দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নিরা৷ তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এখনও হাল ছাড়তে নারাজ৷

বিএনপির পাঁচ নেতা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসক নেতা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ ২-এর সাবেক সংসদ সদস্য ও ঝিনাইদহ বিএনপির সভাপতি মো. মশিউর রহমান এবং ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. আব্দুল ওহাব হাইকোর্টে বিভিন্ন মামলায় পাওয়া তাঁদের দণ্ড স্থগিত ও নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য হাইকোর্টে রিট করেন৷

দুই দিন শুনানির পর মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেন৷ আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আপিল এবং দণ্ড স্থগিত এক নয়৷ দণ্ড স্থগিত না হলে নির্বাচনে অংশ নেয়া যাবেনা৷ নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কেউ কমপক্ষে দুই বছর দণ্ডিত হলে ওই দণ্ডভোগের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হবেন৷

এই মামলার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক ডয়চে ভেলেকে জানান,‘‘নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য আপিল এবং জামিন যথেষ্ট নয়৷ দণ্ড স্থগিত বা আপিলে তাঁকে খালাস পেতে হবে৷ যাঁরা আবেদন করেছেন তাঁরা আপিল করে জামিনে থাকলেও তাঁদের দণ্ড স্থগিত বা তাঁরা খালাস পাননি৷ তাই তাঁরা নির্বাচন করতে পারবেন না বলে আদালত রায়ে বলেছেন৷ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(ঘ)-এ বলা হয়েছে, ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর সাজা হলে সেই সাজা ভোগের আরো পাঁচ বছর পার হতে হবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্য হতে৷ আর বিচারিক আদালতের রায়কেই ভিত্তি ধরতে হবে বলে আদালত জানিয়েছেন৷”

এই রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ডয়চে ভেলেকে জানান, খালেদা জিয়া নির্বাচনে দাড়াতে পারবেন না৷, ‘‘নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য আপিল এবং জামিন যথেষ্ট নয়৷ দণ্ড স্থগিত বা আপিলে তাঁকে খালাস পেতে হবে৷ ‘‘নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য আপিল এবং জামিন যথেষ্ট নয়৷ দণ্ড স্থগিত বা আপিলে তাঁকে খালাস পেতে হবে৷ এখানে শর্ত ২টি৷ তা হলো- তিনি যদি কমপক্ষে দুই বছর দণ্ডিত হন তাহলে পারবেন না৷ আর মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরের আগে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না৷ কাজেই খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে দুইটি প্রতিবন্ধকতাই আছে৷ কোনো আদালত তার রায় দিয়ে এই সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করতে পারেন না৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘আদালতে আমি শুনানিতে বলেছিলাম, ফৌজদারি আদালত বিশেষ করে ফৌজদারি আপিল আদালত অবশ্যই তাঁদের সাজা স্থগিত করতে পারেন৷ কিন্তু কনভিকশন বা তাঁকে যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, সেটির স্থগিত নেই৷”

খালেদা জিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন৷ জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁর প্রথমে পাঁচ বছর এবং রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে তা ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়৷ এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাঁর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়৷ দু’টি মামলার রায়ের বিরুদ্ধেই আপিল করা হয়েছে৷

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কাঁরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, তা বলা আছে এবং সেখানে নানা ধরণের অযোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ধারা ২ বিবেচ্য৷ আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ধারা ২-এর উপধারা ঘ নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে৷ তাতে বলা হয়েছে, ‘(ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে৷”

“আইন যদি নিজস্ব গতিতে চলে, খালেদা জিয়াও নির্বাচন করতে পারবেন’’

খালেদা জিয়ার পক্ষে মোট তিনটি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র কেনা হয়েছে৷ জানা গেছে, বুধবারের মধ্যে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেয়া হবে৷

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অ্যাটর্নি জেনারেল আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে পাননি৷ তিনি রাজনৈতিক লোক৷ তাই রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন৷ খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত দেবে নির্বাচন কমিশন, রিটার্নিং অফিসার৷ তাঁর দুটি মামলাই আপিলে আছে৷ মামলা আপিলে থাকা মানে হলো মামলাটি চলমান৷ রায় চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া যাবেনা৷ যদি দেশে আইনের শাসন থাকে তাহলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন৷”

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে আদালত বলতে সর্বোচ্চ আদালতকে বোঝানো হয়েছে৷ আর সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ৷ আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পরই কাউকে দণ্ডিত বলা যাবে, তার আগে নয়৷ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় আপিল বিভাগ দেয়নি৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দণ্ডিত হওয়ার পরও তাঁরা মন্ত্রিত্ব করেছেন এবং নির্বাচনও করেছেন৷ আমরা মনে করি, আইন যদি নিজস্ব গতিতে চলে তাহলে খালেদা জিয়াও নির্বাচন করতে পারবেন৷”

ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া নিম্ন আদালতের দণ্ড উচ্চ আদালতের স্থগিত আদেশের মাধ্যমে মন্ত্রিত্বে বহাল ছিলেন এবং নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হয়েছেন৷

২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময়৷ ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাই৷ ৯ ডিসেম্বর প্রত্যাহারের শেষ সময়৷সূত্র: ডি  ডাব্লউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *